লাল সোনা খ্যাত জাফরানের চাষ

লাল সোনা খ্যাত জাফরানের চাষ

বাংলা নাম জাফরান, ইংরেজিতে স্যাফ্রন (saffron) যার বৈজ্ঞানিক নাম Crocus sativas। জাফরান পৃথিবীর অন্যতম দামী মসলা। এটি ‘রেড গোল্ড’ নামেও পরিচিত। প্রাচীন যুগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাফরানের সুগন্ধ ও উজ্জ্বল রঙের গুরুত্ব অনুধাবন করে এ জাফরান ব্যবহার সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে ব্যাপক প্রচলন ছিল। এ ফসলের আদিস্থান গ্রীস। ইউরোপিও ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশেই জাফরান চাষ প্রচলন আছে। আফগানিস্থান, ইরান, তুরস্ক, গ্রীস, মিশর, চীন এ সব দেশে কম বেশি জাফরানের চাষ হয়ে থাকে। স্পেন ও ভারতের কোন কোন অংশে বিশেষ করে কাশ্মীরে এ ফসলের চাষ অনেক বেশি। বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ জাফরান স্পেন রপ্তানী করে থাকে।

জাফরান আসলে একটি ফুলের শুকনো রেণু। ফুল গাছটির নাম ক্রোকাস স্যাটিভাস। মূল্যবান হওয়ার জন্য জাফরানের আরেক নাম লাল সোনা। ক্রোকাস স্যাটিভাস বিশ্বের যে কোন জায়গায় হতে পারে। তবে ঝুরঝুরে বেলে-দোআঁশ মাটি জাফরান চাষের উপযোগী। স্বল্প আলোতে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জাফরান ভালো জন্মায়। এই গাছকে বড় করা কোনও কষ্টসাধ্য নয়। যেটা কষ্টসাধ্য সেটা হল ফুল থেকে রেণুগুলিকে সরিয়ে নেওয়া। এই কাজ করার জন্য প্রচুর শ্রমিকের দরকার। কারণ একটা একটা করে ফুলের রেণু সংগ্রহ করতে হয়। আর এই কাজটির জন্যই জাফরানের এত মূল্য। ১পাউন্ড বা ৪৫০ গ্রাম শুকনো জাফরানের জন্য ৫০ থেকে ১ লাখ ফুলের দরকার হয়। এক কেজির জন্য ১০ লাখ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ফুলে প্রয়োজন পরে। ৪০ ঘন্টা সময় লাগে ১ লাখ ৫০ হাজার ফুল তুলতে । জাফরান’ প্রতি কেজি’র মূল্য প্রায় ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আসল জাফরান চিনবেন যেভাবে

জাফরান কেনার সময় ক্রেতাদের অনেক ক্ষেত্রে ঠকিয়ে দেন বিক্রেতারা। কারণ, বাজারে নকল জাফরান বিক্রি হয়। কুসুম নামের ফুলের পাপড়ি দিয়ে নকল জাফরান তৈরি করা হয়। কুসুম ফুল থেকে তৈরি গুড়ার রঙ লাল টকটকে হওয়ার কারণে নকল আর আসল জাফরানের পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। জাফরান কেনার সময় ক্রেতাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

বংশ বিস্তার

গাছের মোথা বা বালব (অনেকটা পেঁয়াজের মত) সংগ্রহ করে তা বংশ বিস্তারের কাজে ব্যবহার করা হয়। এক বছর বয়স্ক গাছ থেকে রোপন উপযোগী মাত্র দু’টা মোথা (Bulb) পাওয়া যায়। তবে ৩-৪ বছর পর একেক গাছ থেকে ৫-৭টা মোথা পাওয়া যেতে পারে। নূতন জমিতে রোপন করতে হলে ৩-৪ বছর বয়স্ক গাছ থেকে মোথা সংগ্রহ করে তা জমিতে রোপন করতে হবে। একই জমিতে ৩-৪ বছরের বেশি ফসল রাখা ঠিক নয়। মোথা বা বালব উঠিয়ে নূতন ভাবে চাষ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

জমি নির্বাচন

প্রায় সব ধরনের জমিতে জাফরান ফলানো যায়। তবে বেলে- দোঁআশ মাটি এ ফসল চাষে বেশি উপযোগী। পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু বা মাঝারী উঁচু জমি এ ফসল চাষের জন্য নির্বাচনে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত রোদ ও আলো-বাতাস প্রাপ্তি সুবিধা আছে এমন স্থানে এ ফসল আবাদ ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাফরান চাষ পদ্ধতি

তৈরী বীজ তলার জন্য প্রায় ১৫০টা জাফরানের মোথার প্রয়োজন হয়। বর্ষা শেষ হওয়ার পূর্বক্ষণে জুলাই- আগষ্ট মাসে এ ফসলের মোথা বা বালব (Bulb) রোপন করা হয়। শুরুতে বেশি গভীর ভাবে জমি চাষ করে তৈরী কালে প্রতি শতক জমিতে পঁচা গোবর/আবর্জনা পঁচা সার ৩০০ কেজি, টিএসপি ৩ কেজি এবং এমওপি ৪ কেজি প্রয়োগ করে ভালোভাবে মাটির সাথে সমস্ত সার মিশিয়ে হালকা সেচ দিয়ে রেখে দিয়ে দু’সপ্তাহ পর জাফরান বালব রোপন উপযোগী হবে। বসতবাড়ি এলাকায় এ ফসল চাষের জন্য বেশি উপযোগী।

পরিচর্যা

এ ফসল আবাদ করতে হলে সব সময় জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। মাঝে মাঝে নিড়ানী দিয়ে হালকা ভাবে মাটি আলগা করে দেয়া হলে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুবিধা হবে এবং গাছ ভালোভাবে বাড়বে। শুকনো মৌসুমে হালকা সেচ দেয়া যাবে। তবে অন্য ফসলের তুলনায় সেচের প্রয়োজনীয়তা অনেক কম। বর্ষায় পানি যেন কোন মতে জমিতে না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পানি জমে থাকলে রোপিত বালব পঁচে যাবে।

আপদ ও রোগ বালাই

এক প্রকারের ইঁদুর, চিকা ও খরগোস জাফরানের পাতা, ফুল এমনকি গাছের মোথা খেতে পছন্দ করে, মোথা যত খায় নষ্ট করে তার দ্বিগুণ। এ জন্য এ ধরনের উপদ্রব দেখা গেলে প্রয়োজনীয় ফাঁদ ব্যবহার করে অথবা মারার জন্য ঔষুধ ব্যবহার করে তা দমন ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিকড় পচা রোগ

এটা জাফরানের খুব ক্ষতিকর রোগ। এ রোগের আক্রমণে শিকড় পঁচে গাছ মারা যায়। এ রোগ যথেষ্ট ছোঁয়াচে, এ জন্য বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করা দরকার এবং আক্রান্ত জমিতে দু-এক বছর জাফরান চাষ করা যাবে না।

জাফরান সংগ্রহ

রোপনের প্রথম বছর সাধারণত ফুল আসে না। তবে জাফরানের রোপিত বালব আকারে বেশ বড় হলে সে বছরই জাফরান গাছ থেকে মাত্র একটা ফুল ফুটতে পারে। পরের বছর প্রতি গাছে পর্যায়ক্রমে ২-৩ টা ফুল আসবে। দু’বছরের গাছে ৪-৫টা এবং তিন বছরের গাছে ৭-৮টা ফুল দিবে। জাফরানের স্ত্রী অঙ্গ ৩টা থাকে এবং পুরুষ অঙ্গ ও ৩’টা থাকে। গাছে অক্টোবর মাস থেকে ফুল দেয়া আরম্ভ করে এবং নভেম্বর মাস পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

জাফরানের গুণ

আকারে ছোট হলেও সবচেয়ে মূল্যবান এ সুগন্ধী বিশ্বব্যাপী রান্নার উপকরণ হিসেবে খ্যাত। এর বাইরে জাফরানের কিছু ঔষধী গুণও রয়েছে। শরীরের মেদ কমানো, কামোদ্দীপক, পেট ফাঁপা নিরাময়, নারীদের মাসিক নিয়মিত করার কাজে ব্যবহার হয় জাফরান। এ ছাড়া ক্যান্সার থেকে রক্ষা, জ্ঞান আহরণ ও স্মৃতিশক্তির স্থায়ীত্ব বাড়ানো, বিলম্বিত বয়ঃসন্ধি, যৌনশক্তি বাড়ানো, টাক মাথায় চুল গজানো, ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা, খাবার মুখরোচক করা : খাবারকে সুগন্ধী ও মুখরোচক করতে জাফরানের জুড়ি মেলা ভার। এ ছাড়া খাবার আকর্ষণীয় ও রঙিন করার কাজটিও করে জাফরান। জাফরানের ঝলমলে রং মানুষকে খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন ধরনের কেক ও বিস্কুট তৈরি, মাছ মেরিনেট করতে, পোলাও ও বিরিয়ানি রান্না করতে জাফরান ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া কফি, বিভিন্ন ধরনের ফলের শরবত, দই, লাচ্ছি তৈরি করতেও এটি কাজে লাগে।

সতর্কতা

অনেক গুণসম্পন্ন এ জাফরান অতিমাত্রায় খাওয়া যাবে না। নারীদের ক্ষেত্রে অন্তঃস্বত্বা অবস্থায় এটি কোনো খাবারে ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া এক বা দুই চামচের বেশি খেলে যেকোনো মানুষ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।

এগ্রোবাংলা ডটকম
সুলভে কৃষি পন্য ক্রয়ে আস্থা রাখুন বাংলাদেশের প্রথম কৃষি ভিত্তিক ইকমার্স ‘এগ্রোবাংলা শপ’ এ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*