মাছ চাষে শীতকালীন খাদ্য ব্যবস্থাপনা

মাছ চাষে শীতকালীন খাদ্য ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশে মাছ চাষে সম্পূরক খাদ্য ব্যবহার প্রায় দুই যুগ আগে শুরু হয়। এর মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশে মাছ চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও মাছের খাদ্য বিষয়ে পরিপূর্ণ ধারণা মাছ চাষিদের মধ্যে গড়ে উঠেনি। এখনো দেশের অধিকাংশ মাছ চাষি বিভিন্ন কোম্পানির বাজারজাতকৃত মৎস্য খাদ্যের উপরই নির্ভরশীল। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি কিছুটা আমিষের মান ঠিক রেখে মাছের খাদ্য উৎপাদন করলেও অধিকাংশ কোম্পানিই মৎস্য খাদ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করে না। মাছের খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋতুভেদে মাছের চাহিদানুযায়ী খাদ্য উৎপাদন করছে না। অথচ শীত ও গ্রীষ্মকালে মাছের খাদ্য চাহিদা বিভিন্ন দিক থেকে এক নয়। যার উপর মাছের উৎপাদন খরচ ও লাভ লোকসান অনেকটাই নির্ভরশীল। চাষিদের সুবিধার্থে বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলে ধরার চেষ্টা করছি-

ঋতুভেদে মাছের খাদ্য চাহিদা:
মার্চ থেকে অক্টোবর মাসকে মাছ উৎপাদনের অনুকূল সময় হিসাবে ধরা হয়। এ সময় মাছের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ঘটে। পানির গড় তাপমাত্রা ৩২ থেকে ৩৩ ডিঃ সেঃ থাকায় উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নার্সারি খাদ্যে ৩৪ থেকে ৩৫ ভাগ প্রাণীজ ও উদ্ভিদ প্রোটিনের সমন্বয় রেখে খাদ্য তৈরি করতে হয়। অন্যদিকে গ্রোয়ার খাদ্যে রাখতে হয় ২৭ থেকে ২৮ ভাগ। শীতকালে মাছ চাষের জন্য পরিবেশ প্রতিকূল থাকে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে মাছের খাদ্য গ্রহণ কমে যায়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চার মাস তাপমাত্রা কম থাকার ফলে মাছ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের রোগ-বালাই দেখা দেয়। শীতকালীন মাছের রোগের জন্য বাংলাদেশে বর্তমান প্রচলিত খাদ্য ব্যবস্থাও অনেকটা দায়ী যা সাধারণত অনেকে জানেন না। শীতকালে তেলাপিয়া মাছে কিছুটা বৃদ্ধি ঘটলেও অন্যান্য সব মাছে বৃদ্ধি ঘটে না। পাঙ্গাস মাছে বরং চর্বি ভেঙ্গে ওজন ঘাটতি হয়। এমন একটি অবস্থায় শীতকালে মাছের গ্রেয়ার খাদ্যে ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ২০ ভাগ আমিষ ও ৭ ভাগ চর্বি রেখে খাদ্য তৈরি করা উচিৎ।

খাদ্যে ভিটামিন ও খনিজ এর গুরুত্ব:
গবেষণা থেকে জানা যায়, মাছের খাদ্যে অন্যান্য সব উপাদান ঠিক রেখে শুধু মানসম্পন্ন ভিটামিন প্রিমিক্স ব্যবহারের ফলে ১৫ থেকে ২০ ভাগ বেশি উৎপাদন পাওয়া যায়। আবার এর সাথে খনিজ সহযোগে খাদ্য তৈরিতে উৎপাদন পাওয়া যায় ২০ থেকে ২৫ ভাগ বেশি। অর্থাৎ খাদ্য রূপান্তর হার কমে উৎপাদন খরচও অনেক কম হয়। এ ছাড়া খাদ্যে ভিটামিন ও খনিজ ব্যবহারে যে সুফলটি পাওয়া যায় তা হচ্ছে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি। শীতকালে ব্যাকটিরিয়াজনিত বিভিন্ন প্রকার রোগের আক্রমণ হয়। এ অবস্থা মোকাবিলায় করা যায় খাদ্যে নিয়মিত প্রয়োজন অনুপাতে ভিটামিন ও খনিজ ব্যবহার করলে।

খাদ্যে চর্বির পরিমাণ:
মাছের খাদ্যে আমিষের পাশাপাশি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ চর্বি থাকা আবশ্যক। শীতকালে মাছের ওজন কমে যাওয়ার পেছনে যে কারণটি মূলত দায়ী তা হচ্ছে খাদ্য গ্রহণ না করা বা কম গ্রহণ করার ফলে মাছের দেহে জমে থাকা চর্বি ক্ষয়। মাছের খাদ্যে চর্বির পরিমাণ ৬ থেকে ৭ ভাগ থাকা উচিৎ কিন্তু বাংলাদেশে এ ব্যপারে মোটেই গুরুত্ব দেয়া হয় না। দেশের মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন কোম্পানির খাদ্যের পরিমাণ ঠিক থাকে না। কোন কোন প্রতিষ্ঠান তাদের খাদ্যের প্যাকেটের গায়ে চর্বির পরিমাণ ৩ ভাগ লিখে বাজারজাত করছে যদিও চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণটি কম তার পরও পরীক্ষাগারে দেখা গেছে উক্ত খাদ্যে চর্বির পরিমাণ ২ ভাগেরও নীচে আছে। সম্পূরক খাদ্যে চর্বির পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম থাকার ফলে মাছ আকর্ষণীয় রং হারায় যার কারণে বাজার দর কিছুটা কম হয়।

শীতকালীন খাদ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা:
অনেকেরই জানেন খাদ্যে আমিষের মাত্রা বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়ে। সে ক্ষেত্রে শীতকালে মাছের আমিষের চাহিদা কম থাকা সত্বেও অধিক আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োগে অপচয়সহ মাছের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। অপচয়ের ধরণ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দুইভাবেই হতে পারে। প্রথমত, মাছ সে খাদ্য গ্রহণ করছে কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আমিষের কার্যকারিতা থাকছে না বা হজম হচ্ছে না ফলে মলের সাথে আমিষ বের হয়ে আসছে। আবার মাছ যদি খাদ্য গ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে অপচয় হচ্ছে সরাসরি। উভয় ক্ষেত্রেই অপচয়কৃত আমিষ পচনের ফলে পানি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং পানিতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যাকটিরিয়ার জন্ম হয়। শীতকালে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার ফলে উক্ত ব্যকটিরিয়া নানা ধরনের রোগে মাছকে সহজেই আক্রান্ত করে।

মাছ চাষে সিংহ ভাগ খরচ যেখানে মাছের খাদ্য ক্রয় বাবদ ব্যয় হয় তাই এখানে সতর্ক দৃষ্টি দেয়া অত্যন্ত জরুরি। মাছের খাদ্যে প্রতারিত হলে বা অপচয় হলে সাধারণ চাষি যারা নিয়মিত ওজন পরীক্ষা করেন না তারা মাছ বিক্রয়ের পূর্বে ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে পারবেন না। বর্তমানে যেখানে মাছ চাষ একটি সীমিত লাভের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে সেখানে বিষযটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলে মাছ চাষিরা উপকৃত হবেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*